পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট: দায় কি শুধু শিক্ষকের, নাকি আমাদেরও? মতামত |

এ এম রিয়াজ কামাল হিরণ, চট্টগ্রাম।। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ হলেই তার সমস্ত দায় ঢালাওভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষকদের ঘাড়ে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বাস্তব জীবন—সবখানেই শিক্ষকরা কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই প্রশ্ন জাগে—একটি সন্তানের ব্যর্থতার পেছনে কেবল কি শিক্ষকই দায়ী? নাকি অভিভাবক হিসেবে আমাদের নিজেদের দায়িত্বেও বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে?
অনেকেই মনে করেন, সন্তানকে একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে পারলেই অভিভাবক হিসেবে তাদের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্কুল থেকে ফেরার পর সন্তান বাড়িতে কতটা সময় পড়াশোনা করছে, তার অগ্রগতি কেমন, সে বিষয়ে কয়জন অভিভাবক নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন? বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সন্তান স্কুলের নাম করে ঘর থেকে বের হয়ে কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে কিংবা মোবাইলের স্ক্রিনে কতটা সময় অপচয় করছে—সেই খবর রাখা কি পরিবারের দায়িত্ব নয়?
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বর্তমান সময়ের পড়াশোনার ধরন আর আমাদের আগের প্রজন্মের পড়াশোনা এক নয়। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষা কারিকুলাম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু ক্লাসরুমের কয়েক ঘণ্টার পড়াশোনার ওপর নির্ভর করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত যত্ন বা বিশেষ ক্লাসের প্রয়োজন হয়।
যখনই কোচিং বা অতিরিক্ত ক্লাসের প্রসঙ্গ আসে, তখনই আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ ঢালাও সমালোচনা শুরু করেন। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠও আমাদের দেখা উচিত। স্কুল শিক্ষকরা বর্তমানে যে সরকারি বা বেসরকারি স্কেলে বেতন পান, তা দিয়ে এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে সংসার চালানো কতটা কঠিন, তা আমরা অনেকেই এড়িয়ে যাই। বাধ্য হয়েই অনেক শিক্ষককে সততার সাথে অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে হয়। এটি তাদের বাড়তি আয়ের একটি বৈধ উৎস। অথচ এই বিষয়টি নিয়েও সাধারণ মানুষকে শিক্ষকদের প্রতি নানা রকম হয়রানিমূলক ও অবমাননাকর মন্তব্য করতে দেখা যায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
একটি সন্তানের ভালো ফলাফলের সমীকরণটি দ্বিমুখী। এখানে শিক্ষক এবং অভিভাবক—উভয়কেই সমান ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষক ক্লাসে পথ দেখাবেন, আর অভিভাবক বাড়িতে সেই পথের তদারকি করবেন। কোনো এক পক্ষের খামখেয়ালিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
তাই আসুন, কোনো বিপর্যয় ঘটলে একে অপরকে দোষারোপ করার সস্তা সংস্কৃতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসি। নিজেরা সচেতন হই এবং মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মানটুকু ফিরিয়ে দিই। সন্তানের পড়াশোনা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের নিয়মিত খোঁজ রাখি। দিনশেষে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টাই পারে আমাদের সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।